সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির অধীনে নারীদের জন্য বিশেষভাবে চালু হওয়া ‘পিংক বাস’ সেবার নারী চালকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রল ও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। তবে এই আজেবাজে মন্তব্য ও প্রতিবন্ধকতার মুখেও তারা দমে না গিয়ে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। রাজধানীর মতিঝিল বিআরটিসি বাস ডিপোতে কথা বলার সময় নারী চালকেরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
গত মঙ্গলবার ঢাকা, বগুড়া ও চট্টগ্রামে নারী চালক ও কনডাক্টর পরিচালিত নারীদের জন্য ১৩টি রুটে মোট ১৪টি বাস চালু করে বিআরটিসি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১০টি রুটে একটি একতলা ও নয়টি দ্বিতল বাস চলাচল করছে। গোলাপি রঙের এই বাসগুলোকে ‘পিংক বাস’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ নারীদের ব্যবস্থাপনায় নারীদের জন্য এ ধরনের বাস সেবা দেশে এবারই প্রথম। এই উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা চলছে। নারী যাত্রীরা স্বস্তি প্রকাশ করলেও এক পক্ষ মনে করছেন, আলাদা বাস না দিয়ে পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থাকেই নারীদের উপযোগী করা উচিত ছিল। অন্য আরেকটি পক্ষ প্রচণ্ড নারীবিদ্বেষী মনোভাব থেকে চালকদের নিয়ে ট্রল করছেন। কিছু সংবাদমাধ্যমও ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রচার করছে।
২৮ বছর বয়সী খাদিজা আক্তার আগে একজন গৃহিণী ছিলেন। ২০২১ সালে গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি পরে নিজেই প্রশিক্ষক হন। বর্তমানে তিনি পিংক বাসের একজন চালক। খাদিজা জানান, নতুন বাস সেবা চালুর পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি ব্যবহার করে হেনস্তা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে না নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রূপ করছেন। তবে তারা কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা দিয়ে নারীদের দমাতে পারবেন না। দেশের সব খাতে নারীরা সফলভাবে কাজ করে যাবেন। খাদিজা আরও জানান, চালক হওয়ার পেছনে তার বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি এবং বিশেষ করে চাকরিজীবী স্বামীর বড় অবদান রয়েছে। বাসে উঠে নারী যাত্রীদের উচ্ছ্বাস তাকে শক্তি জোগায়।
আরেক চালক ৩০ বছর বয়সী মোসাম্মৎ সাথী খাতুন ডিগ্রি পাস করার পর ছয় বছর আগে বিআরটিসি থেকে গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ নেন। বর্তমানে তিনি এমএ পাস করে এলএলবি পড়ছেন। সাভার ইপিজেড এলাকায় স্বামী ও এক সন্তান নিয়ে বসবাস করা সাথী মিরপুর ১০ থেকে মতিঝিল রুটে পিংক বাস চালান। তার স্বামী ও ভাই দুজনেই ট্রাকচালক। সাথী জানান, তার ভাবি তাসলিমা পারভীনও বগুড়ায় পিংক বাসের চালক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। গাড়ি চালানোকে পেশা হিসেবে নিতে তার বাবা ও ভাই সবচেয়ে বেশি সাহস জুগিয়েছেন। সাথী বলেন, কিছু আজেবাজে লোক কথা বলবেই, কিন্তু সেসব কথা মাথায় না নিয়ে তারা আরও ভালো কাজ করে দেখাতে চান।
তিতুমীর কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করা মোসাম্মৎ রাবেয়া খাতুনও এই বাসের একজন চালক। ২০১২ সালে ব্র্যাকের একটি প্রকল্প থেকে বিনামূল্যে গাড়ি চালানো শিখে ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেখানে চাকরি করেন। এরপর বিআরটিসিতে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে ২০২৪ সালে ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স পান। স্বামী ও এক সন্তান নিয়ে মোহাম্মদপুরে থাকা রাবেয়া জানান, শুরুতে পরিবার থেকে বাধার সম্মুখীন হলেও নিজের বিশ্বাসের জোরে তিনি এগিয়ে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রলের বিষয়ে তিনি বলেন, ভালো বা খারাপ যাই করা হোক না কেন, মানুষ ট্রল করবেই। সড়কে নিয়ম মেনে চললে চালকদের এত চ্যালেঞ্জে পড়তে হতো না।
বিআরটিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। মন্ত্রণালয় থেকে কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১৫ জন নারী চালক ও ২৪ জন নারী কনডাক্টর রয়েছেন। বাসে আপাতত তদারকির জন্য পুরুষ প্রশিক্ষক রাখা হয়েছে। ৩২ আসনের নতুন ১০০টি ইলেকট্রিক বাস সংযোজন এবং চালকের সংখ্যা না বাড়া পর্যন্ত কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমে প্রচার কম রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। বর্তমানে সকাল আটটা ও বিকেল চারটায় দুটি ট্রিপ দিয়ে বাকি সময় বাসগুলো ডিপোতে রাখা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচারের কারণে অনেক নারী চালক এখন সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছেন। তবে তারা কাজের মাধ্যমেই নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিতে চান।

