রাজনৈতিক তদবিরে এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলা

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্রয় ও সরবরাহের ক্ষেত্রে বর্তমানে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশের দুটি ভাসমান টার্মিনালের মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে বর্তমানে কোনো এলএনজি কার্গো নেই। সোমবার কার্গো আসার কথা থাকলেও সরকারি কর্মকর্তারা তা নিশ্চিত করতে পারেননি। পরিস্থিতি সামাল দিতে উপায়ান্তর না দেখে পেট্রোবাংলা এক্সিলারেট এনার্জিকে সৌদি কোম্পানি আরামকোর কার্গো ‘আল হামরা’ থেকে গ্যাস খালাসের অনুরোধ জানিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি, তবে এক্সিলারেট কর্তৃপক্ষের সাড়া ইতিবাচক বলে জানা গেছে।

পেট্রোবাংলা, আরপিজিসিএল এবং জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল কারিগরিভাবে সচল থাকলেও কার্গোর অভাবে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে এলএনজি ক্রয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে দায়ী করা হচ্ছে। সরকারের এক শীর্ষ নেতার তদবিরে সরাসরি ক্রয় নীতির (ডিপিএম) আওতায় হংকংভিত্তিক কোম্পানি জেন হু শিপিংকে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টনের একটি কার্গো আমদানির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ইউনিট প্রতি ১৪ দশমিক ৯ ডলারে এই কার্গো ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করলেও, সোমবার আসার কথা থাকলেও শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত কোম্পানিটি প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে পারেনি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার দর ২২ ডলার হওয়ায় এত কম দামে সরবরাহ পাওয়া নিয়ে সরকারের ভেতরেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে। গত ১৫ দিনে জ্বালানি বিভাগ রাজনৈতিক তদবিরে এভাবেই ৮টি কার্গো সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় অনুমোদন দিয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, সোমবারের মধ্যে কার্গো না পাওয়া গেলে দেশ আবারও বড় ধরনের গ্যাস সংকটে পড়বে। এর আগে শুক্রবার রাত থেকে ১১ ঘণ্টা এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ ছিল, যেখানে সফলভাবে বয়লার পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। টার্মিনালটি সোমবার পর্যন্ত সরবরাহ দেওয়ার মতো এলএনজি মজুদ রাখলেও এরপর নতুন কার্গো না পেলে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে আরামকোর কার্গোটি বহির্নোঙরে তিন দিন অপেক্ষা করলেও পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার অজুহাতে বার্থিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এখন জেন হু কোম্পানির কার্গো অনিশ্চিত হওয়ায় আরামকোর কার্গোটি খালাসের জন্য এক্সিলারেটকে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

সরাসরি ক্রয় নীতিতে ১৭, ২৩, ২৭ ও ৩০ আগস্ট এবং ৬ সেপ্টেম্বর আরও ৬টি কার্গো আসার কথা থাকলেও এর বিকল্প হিসেবে পেট্রোবাংলা কোনো দরপত্র আহ্বান করেনি। জ্বালানি বিভাগ জেন হু শিপিং, ব্রেক কিউব এবং ম্যাক্সওয়েল নামে তিনটি কোম্পানিকে টেন্ডার ছাড়া এলএনজি আমদানির অনুমতি দিয়েছে। অতীতে ফেব্রুয়ারিতে ১২টি কোম্পানিকে জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও তার কোনো কার্যকর ফলাফল পাওয়া যায়নি। এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, সারা দেশে বৃষ্টি এবং গ্যাস সরবরাহ বাড়ার কারণে শুক্রবার থেকে লোডশেডিং কিছুটা কমেছে। শনিবার বন্ধের দিনে বিকাল ৫টায় সারা দেশে লোডশেডিং ছিল ৭৭০ মেগাওয়াট। এ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ১০৭ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৩৭ মেগাওয়াট। তবে এর আগে দুপুরে লোডশেডিং ছিল দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছেন, দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে হলে আপাতত আরামকোর পুরোনো মডেলের কার্গো থেকে এলএনজি খালাস করতে হবে। নতুবা পুরো দেশ আবার সংকটে পড়বে। তাই এক্সিলারেটকে বারবার আরামকোর জাহাজ গ্রহণ করতে অনুরোধ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ক্রয় সিস্টেমের মধ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিপজ্জনক। এটা তার প্রমাণ। বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী সরকারকে এক কার্গো এলএনজির দাম দিতে হয় ৯৫০ কোটি টাকার বেশি।

জানা যায়, জ্বালানি বিভাগ জেন হু শিপিং, ব্রেক কিউব এবং ম্যাক্সওয়েল নামে তিনটি কোম্পানিকে টেন্ডার ছাড়া দুটি করে মোট ছয়টি কার্গো আনার অনুমতি দিয়েছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে টেন্ডার ছাড়া সরাসরি ক্রয় নীতির আওতায় ১২টি কোম্পানিকে জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি দিয়েছিল জ্বালানি বিভাগ। সেই অনুমোদনের এক ছটাক তেল গত ৬ মাসে আসেনি। এমনকি দুটি কোম্পানি ছাড়া কেউ পারফরম্যান্স গ্যারান্টিও দিতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে আবারও টেন্ডারবিহীন এলএনজি আনার অনুমতি দেওয়া হলো। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদিত ১-২টি কোম্পানি সরব আছে। তারা এলএনজি ঠিক সময়ে দিতে পারে।