অধিকৃত পশ্চিম তীরের উর্বর জর্দান উপত্যকার ফাসায়েল গ্রামের বাসিন্দারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি প্রাকৃতিক পানির ফোয়ারার ওপর নির্ভর করে আসছেন। এটি তাদের খাবার, গৃহস্থালি কাজ এবং কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার একমাত্র ভরসা। তবে সম্প্রতি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা এই পানির উৎস দখল করে নিয়েছে। তারা ফিলিস্তিনিদের সেচের পাইপলাইন বিচ্ছিন্ন করে সেই পানি একটি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক পুলের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
স্থানীয় কৃষক সাদ নেমার জানান, গত জুন মাসে বসতি স্থাপনকারীরা তাঁর সেচের পাইপলাইন দখল করে নেয়। এরপর তারা পুলটিকে একটি ইসরায়েলি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রচার শুরু করে এবং এর চারপাশে বিনোদন পার্ক তৈরির কাজ করছে। নেমার ২০২৫ সালের কোগ্যাট (ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা) কর্তৃক জারি করা জমির মালিকানা দলিল এবং ১৯৫৭ সালের মানচিত্র উপস্থাপন করে দাবি করেন, ফোয়ারা ও পুল উভয়ই তাঁর জমির অন্তর্ভুক্ত। তবে এ বিষয়ে কোগ্যাট বা ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ কোনো মন্তব্য করেননি।
পানির অভাবে নেমারের গ্রিনহাউস ও খেতগুলো এখন শুষ্ক পড়ে আছে। তিনি জানান, পানির অভাবে ফসল ফলাতে না পারায় অনেক পরিবার জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে ফোয়ারার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করায় বসতি স্থাপনকারীরা তাঁর এক কর্মচারীকে মারধরও করেছিল।
২১ বছর বয়সী ইয়েশাই শ্রাইবার নামের এক ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী জানান, এখন বড় বড় ইহুদি দল সেখানে গোসল করতে আসায় ফিলিস্তিনিরা সেখানে আসতে ভয় পায়। এদিকে ফিলিস্তিনি মাঠগবেষক ফারেস ফোকাহা জানান, বসতি স্থাপনকারীরা উত্তর জর্দান উপত্যকার ৯৫ শতাংশ ফোয়ারার দখল নিয়েছে। কুসরা গ্রামেও সম্প্রতি তিনটি বাড়ির বিদ্যুৎ ও পানি–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা ঘটেছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা আদেল ইয়াসিন এই পরিস্থিতিকে ‘পানিযুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি এটিকে একটি নীরব বুলেট হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পিত অভিযানের অংশ। জাতিসংঘের তথ্যমতে, চলতি বছর ফিলিস্তিনি অঞ্চলের অন্তত ১৬০টি পানি ও পয়োনিষ্কাশন কেন্দ্রে হামলা হয়েছে।
বসতি স্থাপনকারী নেতা এলিয়াভ লিবি দাবি করেছেন, পুলটি বাইবেল যুগের রাজা হেরোডের। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্থা ‘ইমেক শেভের’ প্রত্নতাত্ত্বিক অ্যালন আরাদ জানান, পুলটির ইতিহাস বা উৎস স্পষ্ট নয় এবং এভাবে পানি ভর্তি করে বসতি স্থাপনকারীরা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটির ক্ষতি করছে। অর্থমন্ত্রী স্মোটরিচ এই পুল সংস্কারে ৩০ লাখ শেকেল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা ফিলিস্তিনিদের মতে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে মাটিচাপা দেওয়ার একটি কৌশল।
স্মোটরিচ স্পষ্ট জানিয়েছেন, এর লক্ষ্য হলো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে মাটিচাপা দেওয়া।উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যদেশের মধ্যে ১৫০টির বেশি দেশ গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।জাতিসংঘ ও বেশির ভাগ দেশের সরকার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই বসতিগুলোকে অবৈধ বলে মনে করে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে নেয়, তবে তারা এটিকে অধিকৃত অঞ্চল না বলে বিতর্কিত ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে।ফিলিস্তিনিরা অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান তীব্র সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে।

