গত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। একই সঙ্গে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া কয়েক শ বন্দী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জেলের জালে পুলিশের একটি লুট হওয়া শটগান উঠে আসার ঘটনা এই উদ্বেগকে নতুন করে সামনে এনেছে।
গত সোমবার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের সিংগারপুরে মাছ ধরার সময় এক জেলের জালে একটি শটগান উঠে আসে। পরে পুলিশ নিশ্চিত হয়, এটি গত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্রের একটি অংশ অপরাধীদের হাতে চলে গেছে এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি লুট হওয়া অস্ত্র বিক্রির সঙ্গে পুলিশের এক সদস্যের জড়িত থাকার প্রমাণও মিলেছে। অন্যদিকে, পালিয়ে যাওয়া বন্দীদের মধ্যে ফাঁসির আসামি ও চিহ্নিত জঙ্গিরা থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশি স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদ লুট হয়। এগুলো উদ্ধারে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে যৌথ অভিযান শুরু হয়। চলতি বছরের ৫ জুলাই পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৯টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো ১ হাজার ৩১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৯টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা যায়নি। লুট হওয়া অস্ত্রের তালিকায় বিভিন্ন ধরনের রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান, কাঁদানে গ্যাস লঞ্চার ও বিভিন্ন ধরনের গ্রেনেড রয়েছে।
শুধু পুলিশ ফাঁড়িই নয়, গণ-অভ্যুত্থানের সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি কারাগার থেকেও ২ হাজার ২৪০ জন বন্দী পালিয়ে যান। এ সময় কারা কর্তৃপক্ষ থেকে ৯৪টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল লুট হয়। পালিয়ে যাওয়া বন্দীদের মধ্যে এখনো ৬৮৩ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ২০টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল এখনো উদ্ধার করা যায়নি। কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, ধরা না পড়া বন্দীদের মধ্যে ৬৯ জন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যাদের মধ্যে ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং ৯ জন জঙ্গি। তিনি আরও বলেন, র্যাব ও পুলিশ মাঝেমধ্যে পলাতক বন্দীদের গ্রেপ্তার করছে। কারাগারগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা না থাকলেও দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
লুট হওয়া অস্ত্র দিয়ে অপরাধ সংঘটনের একাধিক ঘটনা ইতিমধ্যে সামনে এসেছে। গত বছরের ৩ মার্চ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় গণপিটুনিতে দুজনের মৃত্যুর আগে নেজাম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া একটি পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়েছিলেন। এতে স্থানীয় এক দোকানদারসহ চারজন গুলিবিদ্ধ হন। পরে পুলিশ তদন্তে জানতে পারে, এই অস্ত্র কেনাবেচায় চাঁদপুরে কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল মো. রিয়াদ জড়িত ছিলেন, যার বাড়ি সাতকানিয়ায়। গত বছরের ২১ মার্চ কনস্টেবল রিয়াদসহ ছয়জনকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও বাকলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা বিদেশি পিস্তলটি লোহাগাড়া থানা থেকে লুট করা হয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর রিয়াদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তিনি ও তাঁর দুই সহযোগী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
এছাড়া গত বছরের ১৯ জুন চট্টগ্রামের জেলেপাড়া রানী রাশমণিঘাট এলাকা থেকে সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে রেড মাসুম নামের এক চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে একটি পিস্তল ও চারটি গুলিসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সিএমপি জানায়, মাসুমের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া পিস্তলটি পাহাড়তলী থানা থেকে লুট করা হয়েছিল, যা দিয়ে ছিনতাই ও ডাকাতি করা হতো। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ধীরগতিতে হলেও কিছু অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে এবং এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তিনি দেখছেন না।

