মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর যখন ইসলামি রাষ্ট্র এক চরম সংকটের মুখে পড়েছিল, তখন দৃঢ় ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে খেলাফত রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রেখেছিলেন প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)। মাত্র দুই বছর তিন মাসের সংক্ষিপ্ত শাসনকালে তিনি আরবের বিভিন্ন গোত্রের বিদ্রোহ দমন, জাকাত অস্বীকারকারীদের প্রতিরোধ, ভণ্ড নবীদের উত্থান প্রতিহত করাসহ পবিত্র কোরআন সংকলনের মতো ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ইরাক ও শামে মুসলিম বিজয়ের ভিত্তি গড়ে তোলার পেছনেও ছিল তাঁর অসামান্য অবদান। তাঁর এই শাসনকাল কেবল প্রথম খলিফার দায়িত্ব পালন ছিল না, বরং এটি ছিল খেলাফত রাষ্ট্রকে সুসংহত করার এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হওয়ার এক দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণের যুগ।
ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, আবু বকর (রা.) হিজরি-পূর্ব প্রায় ৫০ সনে (প্রায় ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তিনি হাতির ঘটনার (আমুল ফিল) প্রায় দুই বছর কয়েক মাস পরে জন্মগ্রহণ করেন এবং সে হিসেবে তিনি মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোট ছিলেন। তাঁর আসল নাম ছিল আবদুল্লাহ এবং আবু বকর ছিল তাঁর উপনাম বা কুনিয়াত। হিজরি-পূর্ব ১৩ সনে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত লাভের পরপরই মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে তিনিই প্রথম নবীজির দাওয়াহ কবুল করেছিলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় নির্যাতিত ও দুর্বল মুসলমানদের মুক্ত করতে আবু বকর (রা.) নিজের অঢেল সম্পদ ব্যয় করেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি বহু নির্যাতিত দাস ও দাসীকে ক্রয় করে মুক্তি দেন, যাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন বিলাল ইবন রাবাহ (রা.)। উমাইয়া ইবনে খালাফের নির্মম নির্যাতনের শিকার বিলালকে মুক্ত করে তিনি ইসলামের প্রথম যুগে এক অনন্য অবদান রাখেন। এরপর ১ হিজরি সনে মক্কায় নির্যাতন চরম আকার ধারণ করলে আল্লাহর নির্দেশে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে মদিনায় হিজরত করেন আবু বকর (রা.)। পথে সাওর গুহার কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়ে তাঁরা ১২ রবিউল আউয়াল মদিনায় পৌঁছান, যা ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার এক নতুন যুগের সূচনা করে।
২ হিজরির ১৭ রমজান বদরের প্রথম বৃহৎ যুদ্ধে তিনি নবীজির অন্যতম প্রধান সহচর হিসেবে অংশ নেন। যুদ্ধের ময়দানে বীরত্বের পাশাপাশি নবীজি যখন আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করছিলেন, তখন পাশে থেকে সান্ত্বনা ও সাহস জুগিয়েছিলেন তিনি। যুদ্ধ শেষে বন্দিদের প্রতি দয়ার নীতি অবলম্বনের পরামর্শও দেন এই মহান সাহাবি। পরবর্তীতে ৬ হিজরিতে হুদাইবিয়ার সন্ধির কঠিন শর্ত নিয়ে অন্য সাহাবিরা উদ্বিগ্ন হলেও আবু বকর (রা.) নবীজির সিদ্ধান্তকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে বলেছিলেন, ‘তিনি আল্লাহর রাসুল। আল্লাহ কখনো তাকে ব্যর্থ করবেন না।’ তাঁর এই দূরদর্শিতা পরবর্তীতে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।
৮ হিজরির রমজানে ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ে অংশ নিয়ে তিনি তাঁর বৃদ্ধ ও দৃষ্টিহীন পিতা আবু কুহাফাকে নবীজির দরবারে নিয়ে আসেন এবং সেখানে তাঁর পিতা ইসলাম গ্রহণ করেন। এছাড়া ৯ হিজরিতে রোমানদের বিরুদ্ধে তাবুক অভিযানের প্রস্তুতিকালে তিনি তাঁর ঘরের সমস্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। তখন নবীজির প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, পরিবারের জন্য কেবল ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে’ রেখে এসেছেন। একই বছর নবীজি তাঁকে প্রথম ‘আমিরুল হজ’ নিযুক্ত করেন এবং তাঁর নেতৃত্বে তিন শতাধিক মুসলিম হজ পালন করেন। ১০ হিজরিতে ঐতিহাসিক বিদায় হজেও তিনি অংশ নেন।
১১ হিজরিতে মহানবী (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার সময় তাঁর নির্দেশে আবু বকর (রা.) নামাজে ইমামতি করেন। এমনকি মহানবী (সা.) কিছুটা সুস্থ হয়ে মসজিদে এলে আবু বকর (রা.)-এর পাশে বসেন এবং তাঁর ইমামতি অনুসরণ করেন। এরপর ১১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল (৮ জুন ৬৩২ খ্রি.) নবীজির ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহর গভীর শোকের মুহূর্তে তিনি সুরা আলে-ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করে সবাইকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করান।
নবীজির ইন্তেকালের দিনই মদিনার বানু সাঈদার প্রাঙ্গণে আনসার ও মুহাজিরদের আলোচনার ভিত্তিতে তিনি খলিফা নির্বাচিত হন এবং হযরত উমর (রা.) প্রথম তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। ১৩ রবিউল আউয়াল মসজিদে নববীতে সাধারণ বায়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও আল্লাহর আনুগত্যকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ঘোষণা করা হয়। খেলাফতের শুরুতেই আরবে বিদ্রোহের আশঙ্কা সত্ত্বেও তিনি নবীজির নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। শামে উসামা ইবনে জায়েদের বাহিনী পাঠানোর বিরোধিতা করে অনেকে পরামর্শ দিলেও তিনি ঘোষণা করেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি হিংস্র জন্তু এসে আমাকে ছিঁড়ে খায়, তবু রাসুলুল্লাহ (সা.) যে বাহিনী অভিযানে পাঠিয়েছিলেন, তাদের যাত্রা আমি বাতিল করব না।’ তাঁর এই দৃঢ়তার কারণে সীমান্তে মুসলিমদের শক্তির বার্তা পৌঁছে যায় এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন সহজ হয়।
দাসমুক্তির মাধ্যমে ইসলামের সেবা (হিজরি-পূর্ব ১৩-১০ সন) : ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় দুর্বল ও নির্যাতিত মুসলিমদের মুক্ত করতে আবু বকর (রা.) নিজের সম্পদ ব্যয় করেন। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বহু নির্যাতিত দাস ও দাসীকে ক্রয় করে মুক্তি দেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন বিলাল ইবন রাবাহ (রা.); তিনি ইসলাম গ্রহণের কারণে উমাইয়া ইবনে খালাফের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এভাবে নিজের সম্পদ ব্যয় করে তিনি ইসলামের প্রথম যুগে অসহায় মুসলিমদের রক্ষা এবং ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করতে অসামান্য অবদান রাখেন।

