রিজার্ভ বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় তিন বছরে সর্বোচ্চ

২০২৬ সালের ০৮ সেপ্টেম্বর (08 September 2026) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে গত অর্থবছরে বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই খাত থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ আয় হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা গত তিন অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বৈশ্বিক বাজারে কুপন রেট ও সুদের হার বেশি থাকায় রিজার্ভের বিনিয়োগ থেকে এই রেকর্ড রিটার্ন এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট মুনাফাতেও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বৈদেশিক মুদ্রায় থাকা বিভিন্ন আর্থিক সম্পদ থেকে গত অর্থবছরে মোট ১২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা সুদ আয় হয়েছে। এর মধ্যে বড় অংশ এসেছে বৈদেশিক বন্ড ও ইউএস ট্রেজারি নোট থেকে, যার পরিমাণ ৫ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা স্বল্পমেয়াদি আমানত থেকে ২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা এবং ব্যাংকগুলোকে দেওয়া ঋণ থেকে ২ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা সুদ আয় হয়েছে। অন্যান্য বৈদেশিক সম্পদ থেকে আয় হয়েছে আরও প্রায় ৮৭১ কোটি টাকা।

এর আগের অর্থবছরগুলোতে এই খাত থেকে আয়ের পরিমাণ তুলনামূলক কম ছিল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার আর্থিক সম্পদ থেকে মোট আয় হয়েছিল ৭ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে সুদ আয় ছিল প্রায় ৭ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩–২৪-এ এ খাতের মোট আয় ছিল keg ৬ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬.৩৮ বিলিয়ন ডলারে, আর গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩১.৪৭ বিলিয়ন ডলার।

শুধু আন্তর্জাতিক বাজার নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ খাত থেকেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় অঙ্কের আয় হয়েছে। গত দুই বছর ধরে দেশে উচ্চ সুদহার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিসুদহার ১০ শতাংশে ধরে রাখার কারণে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করতে হয়েছে। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর তারল্য সহায়তা এবং সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতার কারণে গত অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ২২ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা আয় করেছে। তবে এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয়ের পরিমাণ আরও বেশি ছিল, যা ছিল ২৪ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ আয়ের বড় অংশই এসেছে সুদ খাত থেকে। ব্যাংকগুলোকে টাকা ধার দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা আয় করেছে। এ ছাড়া commission ও ডিসকাউন্ট থেকে ৪৩১ কোটি টাকা, লভ্যাংশ বাবদ ২০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৪৭৫ কোটি টাকা আয় হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট পরিচালন আয় বা মোট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা। সব ধরনের খরচ বাদ দেওয়ার পর নিট মুনাফা অর্জিত হয়েছে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা।

বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই নিট মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নিট মুনাফা ছিল ২২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা (মোট মুনাফা ৩৪ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা) এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরে মোট ৪০,৫৬৬ কোটি টাকা মুনাফার মধ্যে নিট মুনাফা ছিল ১৫,৩৯১ কোটি টাকা। অর্জিত নিট মুনাফার সম্পূর্ণ অংশ অর্থাৎ ২৫,৯৭৭ কোটি টাকাই সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং সম্প্রতি বাকি ১৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনসহ বিভিন্ন কাজে মোট ব্যয় হয়েছে ৮,৯৯৩ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিপুল মুনাফা অর্জন নিয়ে অর্থনীতিবিদরা অবশ্য ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য মুনাফা করা নয়, বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের তদারকি, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের সংকটের কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই মুনাফার দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন তার মূল লক্ষ্য ও দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।