বাংলাদেশ রেলওয়েতে তীব্র ইঞ্জিন সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে রেলের বহরে থাকা ২৭০টি ইঞ্জিনের প্রায় ৭৭ শতাংশেরই অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল বা মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। একটি ইঞ্জিনের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর ধরা হলেও, বর্তমানে রেলওয়েতে ৩০ থেকে এমনকি ৭০ বছরের পুরোনো ইঞ্জিন দিয়েও জোড়াতালি দিয়ে ট্রেন চালানো হচ্ছে। এর ফলে প্রতিনিয়ত শিডিউল বিপর্যয় ঘটছে এবং চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিনে আগুন লাগাসহ নানা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। গত তিন মাসে যান্ত্রিক সংকটের কারণে ১ হাজার ১৩টি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে রেলে প্রায় সোয়া ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও রেলের মূল কাঠামোতে কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি। উল্টো ইঞ্জিন সংকটের কারণে বর্তমানে প্রায় ৭৪টি ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এমনকি বিগত সরকারের আমলে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে ১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ৩০০০ সিরিজের নতুন ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিনও মাত্র তিন বছরের মাথায় অকেজো হয়ে পড়েছে। নিম্নমানের যন্ত্রাংশের কারণে এই ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২৫টিই প্রায় অকেজো, যার মধ্যে ১৯টি বর্তমানে ওয়ার্কশপে পড়ে রয়েছে। অথচ এগুলোর মেয়াদ ২০ বছর হওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে অন্তত ১০০টি নতুন ইঞ্জিন কেনা না গেলে আন্তঃনগর ট্রেনসহ অন্যান্য ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, বর্তমান সরকার রেলের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন রেলপথ নির্মাণ, ইঞ্জিন ও কোচসহ রোলিংস্টক সামগ্রী ক্রয়ের কাজ চলছে। রেলে নতুন কোচ যুক্ত হলেও এখন মূল প্রয়োজন ইঞ্জিনের। এজন্য ওয়ার্কশপ ও কারখানাগুলোর উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন ইঞ্জিন ও কোচ ক্রয় নিশ্চিত করে যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে, ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারত থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া ৩০টি ইঞ্জিন বর্তমানে রেলের জন্য বড় আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া ভারত থেকে আমদানিকৃত ২০০টি যাত্রীবাহী কোচের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৯টি দেশে এসে পৌঁছেছে। বাকিগুলো এলে উপহারের ইঞ্জিন দিয়ে আরও অন্তত ২০টি নতুন ট্রেন চালানো সম্ভব হবে। তবে নতুন ইঞ্জিন আমদানির প্রকল্প নেওয়া হলেও চুক্তি স্বাক্ষরের পর সেগুলো দেশে আসতে ৪-৫ বছর সময় লাগবে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চীন ২০টি ইঞ্জিন অনুদান হিসেবে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও তৎকালীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যর্থতায় তা আনা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুততম সময়ে এই ইঞ্জিনগুলো আনার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরেও এই অনুদানের ২০টি ইঞ্জিন এবং দ্বিপাক্ষিক রেল উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দীন জানান, ইঞ্জিনের অভাবে ট্রেন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে কাঙ্ক্ষিত গতি তোলা যাচ্ছে না। তবে চীন থেকে উপহারের ২০টি ইঞ্জিন আগামী এক বছরের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। চীন সরকারের আমন্ত্রণে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই রেলওয়ের একটি প্রতিনিধিদল সে দেশ পরিদর্শনে যাবে। এছাড়া আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীন থেকেও নতুন কোচ আসার প্রক্রিয়া চলছে। তবে দ্রুত পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না পাওয়া গেলে আগামীতে ট্রেন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত সরকারের আমলে ঢাকা-যশোর এবং দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও সেখানে ১৭০টির বেশি ট্রেন চলার কথা থাকলেও চলছে মাত্র ৬টি। নতুন রেলপথ তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ও কোচ কেনা হয়নি। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাবেক ৫ জন রেলপথ মন্ত্রী এবং রেলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ৩০ হাজার কোটি টাকার মামলা রয়েছে। বাংলাদেশে ১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ১৭০ থেকে ২৩৮ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে, যেখানে ভারতে প্রতি কিলোমিটারে ২৬ থেকে ৭০ কোটি এবং চীনে ২৩ থেকে ৪৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের সুফল সাধারণ যাত্রীরা পাচ্ছে না। চীনের ডেমু ট্রেন, লাগেজ ভ্যান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে ইঞ্জিন ক্রয়ে ব্যাপক লুটপাট ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
রেলওয়ের কারখানাসূত্রে জানা গেছে, ওয়ার্কশপগুলোর উন্নয়নে নামমাত্র বরাদ্দ দেওয়া হতো। দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৫৫টি গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫০ ধরনের প্রায় সাড়ে তিন হাজার যন্ত্রাংশ বা স্পেয়ার পার্টসের কোনো মজুত রেলওয়ের কাছে নেই। ফলে কারখানায় মেরামতের জন্য পাঠানো ইঞ্জিন ও কোচগুলো স্তূপ হয়ে পড়ে থাকছে। এছাড়া প্রায় ৪০ শতাংশ ইঞ্জিনের চাকার সঙ্গে যুক্ত ‘ট্রাকশন মোটর’ সচল নেই। একটি ইঞ্জিনে ৪টি মোটর থাকার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ১টি বা ২টি সচল মোটর দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ট্রেন চালানো হচ্ছে, যার ফলে রেলসেতু ও ঢালু রুটে উঠতে গিয়ে ট্রেন মাঝপথেই আটকে যাচ্ছে।
তীব্র ইঞ্জিন সংকটে ভুগছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বর্তমানে রেলের ২৭০টি ইঞ্জিনের প্রায় ৭৭ ভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ। একটি স্বাভাবিক ইঞ্জিনের মেয়াদ বা অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল সাধারণত ২০ বছর ধরা হয়। কিন্তু রেলে ৩০ থেকে ৭০ বছরের পুরোনো ইঞ্জিনও রয়েছে! জোড়াতালি দিয়ে ট্রেন পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ইঞ্জিন সংকটে প্রতিদিন কোনো না কোনো রুটে নিয়মিত যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন বাতিল করতে হচ্ছে। সংকট গভীর হলেই ভেঙে পড়ছে শিডিউল। চলন্ত অবস্থায় ইঞ্জিনে আগুন ধরে যাওয়াসহ নানা ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির মতো ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই। শেষ ৩ মাসে ১০১৩টি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছর রেলে প্রায় সোয়া ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও কিছু চমক ছাড়া রেলের মূল কাঠামোতে কোনো উন্নয়ন চোখে পড়ছে না। ইঞ্জিন সংকটে প্রায় ৭৪টি ট্রেন চালানো বন্ধ রাখা হয়েছে।
তবে জোড়াতালি দিয়ে ৭০ বছরের পুরোনো ইঞ্জিন চালানো গেলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হুন্দাই রোটেম থেকে কেনা নতুন ৩০টি ইঞ্জিন ৩ বছর না যেতেই রেলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্নমানের এই ৩০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২৫টি প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। অথচ এগুলোর আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছিল ২০ বছর। আগামী ৫-৭ বছরের মধ্য অন্তত ১০০ ইঞ্জিন ক্রয় নিশ্চিত করা না গেলে আন্তঃনগর ট্রেনসহ বহু ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে হবে।

