মোদির সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠক: আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপড়েন কাটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে নয়াদিল্লিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই বৈঠক ও তথ্য আদান-প্রদানকে দ্বিপক্ষীয় পরিস্থিতি উন্নতির ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পারস্পরিক উত্তেজনাও এখন অনেকটা প্রশমিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে বসেন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী স্থায়ী এই বৈঠকে বাংলাদেশের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি, সরকারের অবস্থান এবং প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের কাছে ঢাকার প্রত্যাশার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। এই বৈঠকের আগে ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছিলেন ত্রিবেদী। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, সেই বার্তাই সরাসরি মোদির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন হাইকমিশনার।

কূটনীতিতে কোনো হাইকমিশনারের স্বাগতিক দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক শেষে সরাসরি নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীনেশ ত্রিবেদীকে মূলত দুই দেশের সম্পর্কে আস্থা পুনর্গঠনের বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে গত এপ্রিলে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার প্রথম বৈঠকের পর ত্রিবেদী জানিয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যকার সব সমস্যা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব এবং তিনি দুই দেশের সরকারপ্রধানের সরাসরি বসার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

এই কূটনৈতিক তৎপরতার নেপথ্যে রয়েছে ভারতের মাটিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক অডিও বক্তব্যকে ঘিরে ঢাকার তীব্র অসন্তোষ। ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাব আয়োজিত অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্যকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে বিষোদগার হিসেবে দেখছে ঢাকা। হাসিনাকে যেন এ ধরনের মতবিনিময়ের সুযোগ না দেওয়া হয়, সে বিষয়ে দিল্লিকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও অনুষ্ঠানটি হতে দেওয়ায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনাকে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননাকর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। পাশাপাশি বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধের বিষয়টিও পুনরায় সামনে আনা হয়।

এই ঘটনার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয় যে, ওই অনুষ্ঠান আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে ব্যক্ত মতামত ভারতের সরকারি অবস্থানের প্রতিফলন নয়। তবে ভারতের এমন অবস্থানকে অনেকে ‘দ্বিচারিতা’ বলে সমালোচনা করেছেন। খোদ ভারতীয় পর্যবেক্ষক ও টেলিগ্রাফ অনলাইনের এক সম্পাদকীয়তেও ভারতের মাটিতে হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার সমালোচনা করে বলা হয়েছে, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে নয়াদিল্লিকে অবশ্যই হাসিনার ছায়া থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করা, পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্কের দিকে মনোযোগ দেওয়ার বার্তাটি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৪ই আগস্ট মোদির বার্তা নিয়ে পুনরায় ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে দীনেশ ত্রিবেদীর।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিগগিরই দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত যেতে পারেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস নাও সরকারি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে। সফরের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো চূড়ান্ত না হলেও এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনা ইস্যুর কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দিয়ে বরং দ্বিপক্ষীয় সফরের মাধ্যমে সম্পর্ক নতুন করে স্বাভাবিক করার লক্ষ্যেই কাজ করছেন। বহুপক্ষীয় সম্মেলনের রাজনৈতিক জটিলতা এড়াতে নয়াদিল্লিতে একটি স্বতন্ত্র দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।