যশোর শিক্ষাবোর্ডের এসএসসির ফলাফলে ক্রমাবনতি অব্যাহত রয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ‘সবাইকে পাস করিয়ে দাও’ নীতি থেকে সরে আসার কারণে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলের তিনটি পরীক্ষায় পাস, জিপিএ-৫ পাওয়া ও শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। বোর্ড কর্তৃপক্ষ ও পরীক্ষকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এই চিত্র উঠে এসেছে।
যশোর শিক্ষাবোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুল মতিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, আওয়ামী লীগ জমানায় পাসের হার বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হতো। তিনি বলেন, আগে পরীক্ষার্থীরা যা-ই লিখুক, সর্বোচ্চ নম্বর দেওয়ার নির্দেশনা ছিল, কিন্তু এখন সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতার পথ থেকে তারা সরে এসেছেন।
বোর্ড প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল ১ লাখ ২ হাজার ৩১৯ জন। সে হিসাবে পাস করতে পারেনি ৩৬ হাজার ৫৩২ জন। এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমেছে ৫ হাজার ৯১১ জন। কিন্তু পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১৪ হাজার ২২২ জন। অর্থাৎ পরীক্ষার্থী সংখ্যা কমলেও ফেলের হার বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলের চিত্র আরও স্পষ্ট। ২০২২ সালে যশোর বোর্ডে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫১৩। ২০২৩ সালে তা কমে হয় ১৯৩। ২০২৪ সালে আবার ৪২২টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস হয়। কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৭৫টিতে। এবার এই সংখ্যা আরো কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬টিতে। ২০২২ সালের ৫১৩টি থেকে ২০২৬ সালের ৩৬টিতে নামার অর্থ হলো, চার বছরের মধ্যে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ৪৭৭টি, অর্থাৎ প্রায় ৯২.৯৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে কোনো প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল না করলেও ২০২৫ সালে তা ছিল দুটি এবং এবার বেড়ে হয়েছে ১১টি।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার এক পরীক্ষক জানান, আগের আমলে যেকোনো উপায়ে পরীক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা ছিল, যা এখন আর নেই। ফলে যারা সঠিকভাবে পড়াশোনা করেছে, তাদের ফলাফলই প্রতিফলিত হয়েছে। যশোর বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম হোসেন আলী জানান, উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কাউকে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়নি। তিনি শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনের ব্যবহার এবং ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতাকে পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এবার যশোর বোর্ডের অধীনে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ২,৫৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯৪০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৭ জন এবং পাস করতে পারেনি ৪৪ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৪ জন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ২০২৬ সালে ফেল করার হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩.৭৩ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ৭.৩৯ শতাংশ বেশি। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪ সালে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ২০ হাজার ৭৬১ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৪১৯ জনে। ২০২৬ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো ৩,৯৪১ জন কমে হয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮। পূর্ববর্তী বছরের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে ৯,২৮৩ জন। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার প্রায় ৪৪.৭২ শতাংশ কমেছে।
শতভাগ ফেল করা ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যশোর ও সাতক্ষীরার চারটি করে, খুলনার দুটি এবং বাগেরহাটের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আরও বলেন, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা শুধু মোট পাসের হারই কমায়নি, বরং উচ্চ গ্রেড পাওয়ার সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

