এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফলাফল ঘোষণা করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ফল প্রকাশের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা সহপাঠীদের সঙ্গে বাঁধভাঙা আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, সন্তানদের এই সাফল্যে অভিভাবকদের মুখেও ছিল আনন্দের হাসি।
সোমবার সকাল ১০টায় অনলাইনে ফল প্রকাশের পর থেকেই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে জড়ো হতে শুরু করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে, স্লোগান দিয়ে এবং দলবেঁধে নেচে-গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। এ সময় একে অপরের সঙ্গে মিষ্টি বিনিময়, শুভেচ্ছা আদান-প্রদান এবং মুঠোফোনে সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে যায়। অনেক শিক্ষার্থীকে এই আনন্দের মুহূর্ত ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেও দেখা গেছে।
তবে এই আনন্দের মাঝেও কিছু শিক্ষার্থীর চোখে ছিল জল। আশানুরূপ ফলাফল না পেয়ে কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। হলিক্রস স্কুলের শিক্ষার্থী ফারজানা এবার এসএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারেননি। তার মা তনিমা খাতুন জানান, ফারজানা ইংরেজি ও গণিতে ফেল করেছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফারজানা বলেন, এই দুটি পরীক্ষা খারাপ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ফেল করবেন তা তিনি কল্পনাও করেননি। এর আগে মেয়ের পরীক্ষার ফলাফল জানতে বাসায় ইন্টারনেট স্লো থাকায় সরাসরি স্কুলে ছুটে এসেছিলেন অভিভাবক ইকবাল হোসেন, যেন সবার সঙ্গে মিলে মেয়ের সাফল্য উদযাপন করতে পারেন।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৯৭.৯৭ শতাংশে। এ বছর এই প্রতিষ্ঠান থেকে ২,১২৭ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, যাদের মধ্যে ২,০৭৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১,১১৫ জন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থী নার্গিস জুঁই জানান, এই ভালো ফলের পেছনে ছিল তার কঠোর পরিশ্রম। রাতে জেগে এবং দুপুরে না ঘুমিয়ে পড়াশোনা করার সময় তার মা-ও তার সঙ্গে জেগে থাকতেন। বাবা-মাকে খুশি করতে পেরে জুঁই অত্যন্ত আনন্দিত। আরেক শিক্ষার্থী নাবিলা জান্নাত জানায়, উচ্চতর গণিতে ইংলিশ মিডিয়ামের প্রশ্নপত্রের ১২ নম্বরটি ভুল থাকায় সে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিল, তবে জিপিএ-৫ পেয়ে সে এখন অত্যন্ত খুশি। ভবিষ্যতে তার স্বপ্ন একজন চিকিৎসক হওয়া। জিপিএ-৫ পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়া আরশি আলমগীর খান তার এই সাফল্যের জন্য সৃষ্টিকর্তা, বাবা-মা ও শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। মেয়ের এমন সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করে রাহির মা মনিরা বেগম দোয়া করেন যেন তার সন্তান ভবিষ্যতে একজন মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের হলিক্রস উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে এবার শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। বিদ্যালয়টি থেকে মোট ২৪৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৯৮ জন। দুপুর ১২টার পর স্কুল প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে মেতে ওঠে আনন্দের বন্যায়। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সিস্টার কল্পনা কস্তা জানান, নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে গড়ে তোলার কারণেই তাদের শিক্ষার্থীরা প্রতিবারই এমন আশানুরূপ ও ভালো ফলাফল করতে সক্ষম হয়।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজেও দেখা গেছে এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ। গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়ে স্কুল প্রাঙ্গণে ছুটে আসে। স্কুলের স্কাউট সদস্যরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে তাদের বরণ করে নেয়। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া সাদি আল তাসবির ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া জারিফ হাসান তার মা তাহমিনাকে এবং তাহমিদ হাসান তার বাবা ডা. কুদরতে হাসান রুবেলকে সঙ্গে নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করতে আসে। দুপুর ১টা ১০ মিনিটে স্কুলের অধ্যক্ষ অধ্যাপক লাল মোহাম্মদ আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। এবার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২,৭৭৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়, যার মধ্যে চারজন অনুপস্থিত ছিল। উত্তীর্ণ হয়েছে ২,৭২৩ জন এবং পাসের হার ৯৮.০২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১,৪৯০ জন। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ছিল ২,৫৪১ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ২৪১ জন। সন্তানদের সাফল্যে আবেগাপ্লুত অভিভাবক ডা. কুদরতে হাসান রুবেল জানান, সকালের দীর্ঘ অপেক্ষা আর দুশ্চিন্তা মুহূর্তেই স্বস্তিতে রূপ নিয়েছে। আরেক অভিভাবক নাসরিন বলেন, সন্তানদের দিনরাতের পরিশ্রম এবং শিক্ষকদের প্রচেষ্টাই এই সাফল্য এনে দিয়েছে।
এদিকে ফলাফল ঘোষণার পর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন কলেজের বিশাল প্রাঙ্গণে আনন্দের জোয়ার নেমে আসে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অধ্যক্ষের সঙ্গে এই সাফল্য উদযাপন করেন। অভিভাবকরা মাইলস্টোন কলেজের চমৎকার একাডেমিক পরিবেশের প্রশংসা করে শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানান। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় মাইলস্টোন কলেজ থেকে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে ১,৪৯৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ১,৪৮৮ জন। এ বছর সারা দেশে পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ এবং ঢাকা বোর্ডে ৭১.৬৩ শতাংশ হলেও মাইলস্টোন কলেজে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯.৬৭ শতাংশে, যার মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬১৩ জন।
প্রশংসনীয় সাফল্য পেয়েছে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজও। এ বছর এই প্রতিষ্ঠান থেকে ৬৫১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৯৯.৬৯ শতাংশ পাসের হার অর্জন করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০০ জন শিক্ষার্থী, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৬১.৪৪ শতাংশ। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, অভিজ্ঞ বোর্ড অব গভর্নরস ও অধ্যক্ষের দিকনির্দেশনা, গ্রুপটিচার ব্যবস্থা, নিয়মিত মনিটরিং এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থাই এই অসাধারণ ফলাফল অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

