‘রাতে উঠিয়ে নিয়ে যাব’, ‘মেয়েকে এতিম করবেন নাকি’ : ভুক্তভোগীর অভিযোগ; মাটি কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকার আশুলিয়ায় অবৈধভাবে মাটি কাটা ও মাটিবাহী ট্রাক চলাচলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় স্থানীয় এক ব্যক্তিকে গভীর রাতে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন আশুলিয়া থানার এসআই সুমন। একজন ভুক্তভোগী লিখিতভাবে এই অভিযোগ জানিয়েছেন। তবে অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই এবং এসআই সুমনের বক্তব্য এই প্রতিবেদকের কাছে এখনো পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, গতকাল রাত আনুমানিক ২টার দিকে আশুলিয়া থানার এসআই সুমনের মাধ্যমে তার বাড়িতে লোক পাঠানো হয়। সেখানে তাকে মাটি বহনকারী ট্রাক চলাচলের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীকে নিয়ে প্রতিবাদ না করার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, প্রতিবাদ অব্যাহত রাখলে তাকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তার ছোট মেয়েকে সামনে রেখে ‘মেয়েকে এতিম করবেন নাকি’ ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি শুধু একজন নাগরিককে ভয় দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্যের নাম ব্যবহার করে একজন প্রতিবাদকারীকে চাপে রাখার অভিযোগ হওয়ায় এর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাটি কাটা ও মাটিবাহী ট্রাক চলাচল নিয়ে আপত্তি রয়েছে। তাদের অভিযোগ, এতে স্থানীয় সম্পদ ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলেও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, তারা কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, সরকারি সম্পত্তি ও এলাকাবাসীর সম্পত্তি রক্ষার দাবিতে মাটিবাহী ট্রাকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন।
তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। অভিযোগের পক্ষে থাকা বিভিন্ন প্রমাণও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এসিল্যান্ডকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারী ও স্থানীয়দের বক্তব্য, ভয়ভীতি, মামলা কিংবা হামলার আশঙ্কা থাকলেও তারা অবৈধ মাটি কাটা ও পরিবহনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন।
তাদের ভাষ্য, সরকারি সম্পত্তি ও স্থানীয় জনগণের সম্পদ রক্ষার প্রশ্নে তারা কোনো ধরনের চাপের কাছে মাথানত করবেন না। এ কারণে পরিস্থিতি যাতে সংঘাতের দিকে না যায়, সে জন্য প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
অভিযোগকারীর দাবি, আজ রাতেও একটি চক্র মাটি কাটার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাটি বহনের জন্য ট্রাকও প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তবে এই দাবির স্বতন্ত্র প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে মাটি কাটা, ট্রাক চলাচল এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রশাসনের সরেজমিন তদন্তের দাবি উঠেছে।
ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এলাকায় যদি সত্যিই অবৈধভাবে মাটি কাটা হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে এবং তারা কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, মাটি কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের যদি ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্য কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে শুধু অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ নয়, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, মাটি কাটার বৈধ কাগজপত্র যাচাই, মাটির উৎস ও গন্তব্য অনুসন্ধান, মাটিবাহী ট্রাকের চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকায় কোনো নাগরিককে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে অভিযোগে যদি পুলিশ সদস্যের নাম ব্যবহার করে গভীর রাতে বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়ার কথা বলা হয়, তাহলে ওই রাতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য কোথায় ছিলেন, কারা কারা তার সঙ্গে ছিলেন, কোনো সরকারি দায়িত্বে তারা সেখানে গিয়েছিলেন কি না এবং থানার কোনো জিডি বা অফিসিয়াল নথি রয়েছে কি না, এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত, মাটি কাটার বৈধতা যাচাই এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে এসআই সুমনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবস্থানও প্রকাশ করা জরুরি। কারণ অভিযোগটি সত্য হলে তা গুরুতর প্রশাসনিক ও আইনগত প্রশ্ন তৈরি করবে; আর অভিযোগটি অসত্য হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার উপরিদর্শক (এসআই) সুমনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

