ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে অনাগ্রহী ইউরোপের দেশগুলো

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ৫৫আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ৫৬

ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের বর্তমান দূরত্ব আটলান্টিক জোটের সম্পর্কের একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও ইউরোপ এখনও মার্কিন নিরাপত্তা সহযোগিতাকে প্রয়োজনীয় মনে করে, তবে ওয়াশিংটনের প্রতিটি কৌশল বা অর্থনৈতিক চাপের পদ্ধতি অন্ধভাবে অনুসরণ করতে তারা আর আগ্রহী নয়।

সাউথ এশিয়া মনিটরে ৩০ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত নওয়াব খানের এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত রয়েছে ১. ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির তিক্ত অভিজ্ঞতা। ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে যাওয়ার পর ইউরোপ তা টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মার্কিন সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা এবং মার্কিন বাজারে প্রবেশের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হয়। এমনকি ইউরোপের তৈরি বিশেষ বাণিজ্যিক চ্যানেল ‘ইনস্টেক্স’ও কার্যকর হতে ব্যর্থ হয়ে ২০২৩ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, ২. ইউরোপের স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কিছুটা আলাদা। ওয়াশিংটন সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে শর্ত মানতে বাধ্য করতে চায়। বিপরীতে, ইউরোপ পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, ৩. হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি নিরাপত্তা ইউরোপের জন্য বড় উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার পক্ষপাতী। ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি হওয়ায় ইরানকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর সরাসরি বিরূপ প্রভাব ফেলবে, যা ইউরোপের ভোক্তা ও শিল্পের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।

তৃতীয়ত, ৪. ইরানের সঙ্গে ইউরোপের কূটনৈতিক যোগাযোগের মূল্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা ওয়াশিংটনের তুলনায় বেশি। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের বড় ভূমিকা ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধের ‘জুনিয়র অংশীদার’ হয়ে সেই কূটনৈতিক সক্ষমতা নষ্ট করতে চাইছে না ইউরোপ। এছাড়া ট্রাম্পের নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে ইউরোপীয় সরকারগুলোর মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন আবার আলোচনার পথে ফিরলে ইউরোপের হারানো সম্পর্ক পুনর্গঠন করা কঠিন হবে।

সবশেষে, ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে। নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রেখেও নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করাই এর মূল লক্ষ্য। ইরান ইস্যু এখন সেই স্বাধীনতার একটি বড় পরীক্ষা। ইউরোপ ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের বিরোধী নয়, তবে চাপের মাত্রা ও লক্ষ্য নির্ধারণে ট্রাম্প প্রশাসনের একক কর্তৃত্ব মেনে নিতে তারা নারাজ। ইরান ইস্যু মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্কের পরিবর্তনের প্রতিফলন, যেখানে ইউরোপ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে লক্ষ্য এক হলেও তা অর্জনের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।

২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন জেসিপিওএ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইউরোপ দীর্ঘদিন চুক্তিটি রক্ষার চেষ্টা করেছিল। ফলে ইউরোপীয় সরকারগুলোর আশঙ্কা—তারা যদি এখন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করে, কিন্তু পরে ওয়াশিংটন আবার আলোচনার পথে ফিরে যায়, তাহলে ইউরোপের হারানো সম্পর্ক পুনর্গঠন করা কঠিন হবে।