দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংক খাতের সংস্কার, আইএমএফের ঋণ এবং নতুন অর্থবছর নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গুলশানের নিজ বাসভবনে বিশেষ প্রতিনিধি ফখরুল ইসলামকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সরকারের গত ছয় মাসের সাফল্য, ব্যর্থতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের যে সমস্যা রয়েছে, তা চাইলেই কাল সকালে সমাধান করা সম্ভব নয়, এর জন্য সময়ের প্রয়োজন।
অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে এপ্রিল-মার্চ করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, বর্ষাকালে বাজেট বাস্তবায়নের কাজ শুরু হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি আসত এবং শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে টাকা ছাড় করায় অপচয় ও দুর্নীতি হতো। শুষ্ক মৌসুমকে কাজে লাগিয়ে প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে এবং অর্থের অপচয় রোধ করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর জন্য আলাদা কোনো সমীক্ষার প্রয়োজন হয়নি, কারণ সব তথ্য সরকারের কাছেই ছিল।
গত ছয় মাসের অর্থনৈতিক সূচকের অগ্রগতি তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার, যা ১৩ আগস্ট বেড়ে ৩৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২৬ জানুয়ারি যেখানে লেনদেনের ভারসাম্য ছিল ২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত, ২৬ জুলাই তা বেড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে এবং নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হয়েছে এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
তবে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি না হওয়াকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে যায়, যা দেশের উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে নির্বাচিত সরকার হিসেবে তারা নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী জনগণের প্রতিশ্রুতি পূরণে কাজ করে যাচ্ছেন। করনীতিতে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নতুন ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি।
পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া কিছু উদ্যোগের সমালোচনা করে আমির খসরু বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দুই ভাগে ভাগ করা এবং ব্যাংক একীভূতকরণের মতো বিষয়গুলো তারা আধাআধি করে রেখে গেছে, যার ফলে বর্তমান সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে। ব্যাংক রেজোলিউশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণ করা সরকারের একার পক্ষে কঠিন। তবে ক্ষুদ্র বা বড় সব আমানতকারীর টাকা সুরক্ষায় সরকার পূর্ণ উদ্যমে কাজ করছে। ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগের প্রবণতা বন্ধ করতে একটি সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে, যাতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ে।
শেয়ারবাজার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বিগত দিনে শেয়ারবাজারকে ক্যাসিনোর মতো বানিয়ে ফেলা হয়েছিল এবং সবাইকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। নতুন কমিশন গঠনের পর শেয়ারবাজারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। আর্থিক খাতে কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হবে না এবং ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংস্থায় নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে যথাযথ নিরীক্ষা করা হবে।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার দেশের স্বার্থবিরোধী শর্ত মেনে নিয়েছিল। বর্তমান নির্বাচিত সরকার জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে আগের কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং নতুন করে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আইএমএফের শর্তে যদি দেশের মানুষের কষ্ট বাড়ে, তবে সেই ঋণ নেওয়ার চেয়ে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করাকে বেশি গুরুত্ব দেবে সরকার।
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, বিশাল আমদানির কারণে রাজস্বের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তাই ইচ্ছে থাকলেও একসঙ্গে পুরো বেতনকাঠামো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, এটি নিয়ে বর্তমানে হিসাব-কিতাব চলছে। পরিশেষে তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছরের জঞ্জাল সাফ করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সময় লাগবে এবং এই কঠিন অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের পাশাপাশি সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

