অনেকদিন আগের কথা। বাংলাদেশ থেকে চার জন সাংবাদিক গেছেন চীনে। তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইশকুল পরিদর্শনে। চতুর্থ শ্রেণিতে ঢুকলেন চার সাংবাদিক। তারা চীনা ভাষা জানেন। একজন সাংবাদিক ভাবলেন, এরা পড়াশোনা কেমন করে পরখ করে দেখা দরকার! তিনি শিক্ষার্থীদের জিগ্যেস করলেন, “আচ্ছা বলো দেখি, এক লোক সাংহাই থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে দশ কেজি চাল কিনল। থিয়েনচিন থেকে ওই একই চাল ৫০ টাকা কেজি দরে দশ কেজি কিনল। দুই চাল মিশিয়ে ফেলল। এবার সেই মেশানো চাল বেইজিং শহরে ৬০ টাকা কেজি দামে বিক্রি করল। এর সঙ্গে যাতায়াত ভাড়া বা আনুষাঙ্গিক অন্য কোনো খরচ যুক্ত হবে না। বলতে হবে মেশানো সেই চাল বিক্রি করে কেজি প্রতি ওই লোকের কত লাভ বা ক্ষতি হলো।”
পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ। সকলে গভীর চিন্তায় পড়ে গেছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। একজন অন্যের দিকে তাকাচ্ছেও না। এই জটিল অংকের উত্তর বের করতে গিয়ে তাদের নাকাল অবস্থা। শিক্ষকের কপালে বিনবিনে ঘাম। তিনি ভাবছেন, সাপ যদি তার নিজ লেজের দিক থেকে খাওয়া শুরু করে তাহলে শেষ অবস্থা কী দাঁড়াবে?
একজন মেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। গোল মুখ, চাপা নাক, টকটকে ফরসা গায়ের রং, মাথার চুল ছোটো করে কাটা। চোখে চশমা। প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত স্থির তার চোখের দৃষ্টি। সকলে উঠে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে তাকিয়েছে। শিক্ষক ভুরু কুঁচকে তাকালেন তার দিকে। এই মেয়ে কী বলবে তিনি জানেন না। তার উত্তরের ওপর নির্ভর করছে পুরো চীনের শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র। যে উত্তর সে দেবে, তাই শুনে বাংলাদেশ থেকে আসা অতিথিরা বিচার করবেন চীনের শিক্ষা ব্যবস্থা। ক্লাসে শুনসান নীরবতা। কন্যা স্থির গলায় বলল, “ফাঁসি হবে।”
যেন ক্লাসে হঠাৎ ভয়ংকর দেখতে বীভৎস কোনো প্রাণী ঢুকে পড়েছে। আতঙ্কিত দেখাচ্ছে সকলকে। কেন এই মেয়ে হেঁয়ালি করছে! সে কী জানে না তার কথা মানে অতিথিদের কাছে চীনের কথা! সে এখন চীনের প্রতিনিধিত্ব করছে। বাংলাদেশের সাংবাদিক নরম গলায় জানতে চাইলেন, “কেন তার ফাঁসি হবে, মা?” মেয়ে বলল, “৭০ টাকা কেজি দামের চালের সঙ্গে ৫০ টাকা কেজি দরের চাল মেশানো অন্যায়। আর কেউ অন্যায় করলে তার অবশ্যই ফাঁসি হবে।”
বাংলাদেশে লেখাপড়ার প্রাথমিক স্তরে শেখানো হয় লাভ-ক্ষতির অংক। সেখানে অংক করে শিক্ষার্থীদের উত্তর বের করতে হয়, ২,০০০ টাকা মণ দরের এক মণ চালে কত কেজি কাঁকর মেশালে মণপ্রতি ৫০ টাকা লাভ হবে? কিংবা একজন গোয়ালা ৭০ টাকা লিটার দরের ১৫ লিটার দুধে ৩ লিটার পানি মেশালে কেজি প্রতি গোয়ালার কত লাভ বা ক্ষতি হবে?
বউয়ের জন্মদিন। জারবেরা তার পছন্দের ফুল। অফিস থেকে ফেরার সময় দোকান থেকে এক গোছা নীল জারবেরা ফুল নিয়ে বাসায় এলাম। হাসিহাসি মুখে বউয়ের হাতে ফুলগুলো দিয়ে বললাম, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ। জানতাম বউ অত্যধিক খুশি হবে। শুধু জানতাম না, প্রচ- খুশি হয়ে সেই অতি আনন্দের মুহূর্তে সে কী করতে পারে। মুখ শুকনো করে বউ বলল, তুমি দেখি বিরাট বোকা। আগেও বোকা ছিলে, এখনো বোকা আছ! থতমত খেয়ে গেলাম। পয়সা খরচ করেছি বলে সে কপট রাগ দেখিয়ে আমাকে বোকা বলছে। এটা ভালো লক্ষণ। তবে তার মুখে লজ্জার ভাব থাকা কথা। তার মুখ হয়ে আছে কড়া রোদ্দুরে শুকানো পাকা বরইয়ের মতো এবড়োখেবড়ো। লাজুক হাসি দিয়ে বিনয়ী গলায় বললাম, দাম একটু বেশি নিয়েছে, তবে দেখো নীল জারবেরা! এমন কোথাও পাবে না। আমি এরকম টিয়া রং করে তোতা আর চড়ুই রং করে মুনিয়া বলে খাঁচায় ভরে বিক্রি করতে দেখেছি।

