একের পর এক কারিগরি জটিলতা, দুর্ঘটনা এবং দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েনের কারণে মার্কিন নৌবাহিনী এখন গভীর সংকটে পড়েছে। সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাহাজ নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা, রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা এবং নাবিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান মানসিক ও শারীরিক চাপের কারণে সংস্থাটি কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে।
চলতি বছরের ২৪ জুলাই দক্ষিণ চীন সাগরে নিয়মিত অভিযানের সময় মার্কিন গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস বেনফোল্ড গুরুতর কারিগরি ত্রুটির কবলে পড়ে। জাহাজটির জেনারেটর বিকল হয়ে যাওয়ায় টানা চার দিন বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হয় নাবিকদের। এতে বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও খাবার সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। মার্কিন নৌবাহিনী বর্তমানে এই ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত পরিচালনা করছে।
এর আগে মার্চ মাসে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। জাহাজটির লন্ড্রি এলাকায় লাগা আগুন নেভাতে কর্মীদের ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। এতে দুই নাবিক আহত হওয়ার পাশাপাশি ধোঁয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন আরও অনেকে। এছাড়া ইউএসএস হ্যারি এস ট্রুম্যান গত বছর বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। মিসরের পোর্ট সাঈদের নিকটবর্তী এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং লোহিত সাগরে দুটি এফ/এ-১৮ যুদ্ধবিমান হারিয়ে বাহিনীর প্রায় ১০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। তদন্তে এসব দুর্ঘটনার পেছনে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, সীমিত প্রশিক্ষণ এবং অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
সমুদ্রের দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েন নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে অবস্থানরত প্রায় ৫ হাজার নৌসদস্য গত নভেম্বর থেকে সমুদ্রে রয়েছেন। কয়েক দফা সময় বাড়ানোর ফলে জাহাজটি ২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান করছে। এ সময় খাবারের সংকট, পানির অভাব ও পাইপলাইন নষ্ট হওয়ার মতো অভিযোগ উঠলেও নৌবাহিনী এর কিছু অংশ অস্বীকার করেছে।
শুধু সমুদ্রে থাকা জাহাজই নয়, বরং সামগ্রিক অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় উদ্বেগের কারণ। মার্কিন সরকারি হিসাব পর্যবেক্ষণ সংস্থা জিএও-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে জাহাজ নির্মাণের বাজেট প্রায় দ্বিগুণ হলেও নৌবহরের আকার সেভাবে বাড়েনি। গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজ প্রকল্পগুলো দীর্ঘ বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির কবলে পড়েছে। একই সময়ে চীনের নৌবাহিনীর দ্রুত সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন নৌ গোয়েন্দা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চীনের নৌবহরে ৩৭০টির বেশি জাহাজ রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহরে কয়েক বছর ধরে ৩০০টিরও কম জাহাজ বিদ্যমান। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্মাণ জটিলতা এবং নাবিকদের ওপর বাড়তি চাপের মুখে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই নৌবাহিনী এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

