লাকসামে ৪ পরিবারকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা, থানায় ডাকার পর প্রত্যাহার

কুমিল্লার লাকসামে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আদালতে মামলা করায় চারটি পরিবারকে মাইকিং করে সমাজচ্যুত করার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পরিবারগুলো সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ার চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা সৃষ্টি হলে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বুধবার সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। তবে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার হলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মন থেকে আতঙ্ক কাটেনি।

ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের ইছাপুরা গ্রামে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, ইছাপুরা গ্রামের প্রয়াত আবদুর রহমানের ছেলে মমিন আলী এবং একই গ্রামের প্রয়াত আবদুর রশিদের ছেলে আলমগীর হোসেনের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এ বিরোধ মেটাতে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস বৈঠকও হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৯ জুন এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, দুই পক্ষ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে চলতি মাসের ২০ আগস্ট আবারও সালিসে বসবে।

কিন্তু এর মধ্যেই গত ২ জুলাই মমিন আলী বাদী হয়ে আলমগীর হোসেন, অহিদুর রহমান ও নেছার আহমেদের বিরুদ্ধে কুমিল্লার আদালতে একটি মামলা করেন। সালিসের সিদ্ধান্ত অমান্য করে আদালতে মামলা করার অভিযোগ তুলে গত সোমবার সন্ধ্যায় মাইকিং করে মমিন আলীসহ চার পরিবারের সদস্যদের সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দেয় ইছাপুরা পূর্বপাড়া ও পশ্চিমপাড়া সমাজ কমিটি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মাইকে ঘোষণা করতে শোনা যায়, ইছাপুরা উত্তর পাড়ার বাসিন্দা হাজি আবদুর রহমানের পরিবারের সদস্য মমিন আলী, আবদুর রশিদ, আবুল খায়ের আবু ও কোরবান আলীসহ সবাই বর্তমান সমাজ কমিটির আইন ও বিচার মানেন না। সমাজের আইনশৃঙ্খলা অবজ্ঞা করার কারণে তাঁদেরকে সামাজিক সব কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন ও সমাজচ্যুত করা হলো। একই সঙ্গে সমাজের সর্বসাধারণকে তাঁদের সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য মমিন আলী জানান, সমাজচ্যুত করার ঘোষণার পর তাঁরা চরম বিপাকে পড়েন। তিনি বলেন, তাঁরা সমাজের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন না। এমনকি ছোট বাচ্চারা দোকানে গেলেও তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। থানার ওসি ও ইউএনও ডাকার পর সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হলেও তাঁদের আতঙ্ক এখনো কাটেনি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিপক্ষ দলের নেতৃত্বে থাকা আলমগীর হোসেন স্থানীয় গোবিন্দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিনি নিজের রাজনৈতিক পদ ও প্রভাব ব্যবহার করে এই সমাজচ্যুতের মাইকিং করিয়েছেন। তবে আলমগীর হোসেন জমি নিয়ে বিরোধের কথা স্বীকার করলেও মাইকিং করানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, মাইকিং করেছে ইছাপুরা পূর্ব ও পশ্চিমপাড়ার সমাজ কমিটির লোকজন। বুধবার ওসি ও ইউএনও সাহেব দুই পক্ষকে ডেকেছিলেন এবং বিষয়টি সমাধান হওয়ার পর এলাকায় পুনরায় মাইকিং করে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এদিকে, জমি বিরোধের সর্বশেষ সালিসে উপস্থিত থাকা পাশের কান্দিরপাড় ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন জানান, মমিন আলী সমাজকে না জানিয়ে আদালতে মামলা করেছেন, যা ঠিক হয়নি। তবে চার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। ঘটনার বিষয়ে জানতে ইছাপুরা সমাজের সভাপতি রফিক সর্দারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী কামরুন নাহার লাইলী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাইকিংয়ের ভিডিও দেখে পুলিশ ঘটনাটি জানতে পারে এবং মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে গিয়ে সত্যতা যাচাই করে। বুধবার দুই পক্ষকে থানায় ডাকা হয়। এ ঘটনায় কোরবান আলীর স্ত্রী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন, যা মামলা (এফআইআর) হিসেবে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। তবে দুই পক্ষ নিজেরা মীমাংসা করে নেওয়ার অনুরোধ করায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়নি। মাইকিং করা পক্ষটি ভুক্তভোগীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। তবে অসুস্থতার কথা বলে বিএনপি নেতা আলমগীর থানায় উপস্থিত হননি। ওসি আরও জানান, আদালতে করা মামলাটি চলমান থাকবে এবং ভুক্তভোগী পক্ষ চাইলে পরবর্তীতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।