যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব একটি ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশটি নিজস্ব বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি’ হিসেবে পরিচিত এই সমঝোতার ফলে সৌদি আরবের পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা না হলেও মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আওতায় ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিধান এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে এটি ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা চুক্তি থেকে আলাদা হবে। ওই চুক্তিতে আমিরাত নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন করে না এবং আরও নানা ধরনের বিধিনিষেধ মেনে চলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজেও লাগতে পারে। বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই চুক্তির পাশাপাশি একটি দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সুরক্ষা চুক্তিও সই হয়েছে, যা কয়েক দশকব্যাপী বহু বিলিয়ন ডলারের অংশীদারিত্বের আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
সৌদি সরকারের ভাষ্যমতে, এটি তাদের জ্বালানি খাতে বিদ্যমান সহযোগিতারই সম্প্রসারণ। গত নভেম্বরে সৌদি নেতার ওয়াশিংটন সফরের মাধ্যমেই এই চুক্তির পথ প্রশস্ত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করার মাত্র দুই দিন পরেই এই ঘোষণা এল।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, এই চুক্তি পারমাণবিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের রোজমেরি কেলানিকসহ অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া হলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হবে। সেখানে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সমালোচকদের উদ্বেগ নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে এমন কোনো চুক্তি করা হবে না। অন্যদিকে, ডেমোক্রেট সিনেটর এডওয়ার্ড মার্কিসহ অনেকে এই চুক্তির সমালোচনা করে ভণ্ডামির অভিযোগ এনেছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সৌদি আরবের পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না থাকতেই যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সময় থেকেই সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। যদিও আগে ইসরাইলকে স্বীকৃতির শর্ত দেওয়া হতো, এবার সেই শর্ত বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এই চুক্তি সৌদি আরবের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৮ সালে বলেছিলেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করলে সৌদি আরবও সেই পথ অনুসরণ করবে, যদিও বর্তমানে তারা অস্ত্র অর্জনের পরিকল্পনা অস্বীকার করেছে।

