ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি বেসরকারি খাতে দিচ্ছে ভারত

ভারতের প্রতিরক্ষা খাতের সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করার বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) কর্তৃক তৈরি সব প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি এখন থেকে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে, যা দেশটির দীর্ঘদিনের সরকারি একচেটিয়া আধিপত্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের অনুমোদিত এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল লক্ষ্য হলো ক্ষেপণাস্ত্রের গবেষণা ও উন্নয়ন পর্যায় থেকে দ্রুত ব্যাপক হারে উৎপাদনে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা। নির্দিষ্ট কারিগরি যোগ্যতা, শংসাপত্র ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্তাবলী পূরণ করে দেশীয় বেসরকারি কোম্পানিগুলো এখন থেকে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে। সরকারের এই উদ্যোগের ফলে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি অংশীদারদের সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

ব্যাঙ্গালোরভিত্তিক তক্ষশিলা ইনস্টিটিউশনের গবেষক আদিত্য রামানাথন এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, এর আওতা অত্যন্ত বিস্তৃত। এই প্রযুক্তির মধ্যে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি রেডিয়েশন মিসাইল, অ্যান্টি ট্যাংক ব্যবস্থা এবং ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইলের মতো ভারী ও জটিল অস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এতদিন ধরে ডিআরডিওর তৈরি অস্ত্র উৎপাদনের জন্য ভারত মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান 'ভারত ডায়নামিকস'-এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। নতুন এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সেই একচেটিয়া ব্যবস্থার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সীমান্তে চলমান নিরাপত্তা uncertainty বা অনিশ্চয়তা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে ভারত গত এক দশকে তার প্রতিরক্ষা ব্যয় নাটকীয়ভাবে বাড়িয়েছে। ২০১৪ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট যেখানে ছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার, তা বর্তমান অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো প্রমাণ করেছে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে ভারতের প্রধান প্রতিপক্ষ চীনের সক্ষমতা মোকাবিলায় এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা উচ্চ-তীব্রতার যুদ্ধে টিকে থাকতে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই তিন বাহিনীকে নিয়ে একটি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলছে নয়াদিল্লি, যা বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়।

ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা খাতও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বিকশিত হয়েছে। আদানি, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো এবং টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসের মতো বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীসহ প্রায় ৬০০টিরও বেশি কোম্পানি বর্তমানে দেশটির ড্রোন শিল্পে জড়িত। গত জুন মাসে ভারত দেশীয় প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সামরিক ড্রোন কেনার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। এছাড়া জুলাইয়ে ৫.৪৬ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়, যার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও কামিকাজে ড্রোন রয়েছে। নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ভারত মহাসাগরে সক্ষমতা বাড়াতে অন্তত ৭৫টি জাহাজ ও সাবমেরিন সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে। অস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রেও ভারত রাশিয়ার ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইসরাইলের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করছে।

বেসরকারি কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে গোলাবারুদ, ড্রোন ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ শুরু করেছে। যেমন, ২০২৪ সালে উত্তর প্রদেশে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ কারখানায় ৩০ বিলিয়ন রুপির (প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন ডলার) বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস। তবে এই উদ্যোগের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে সরকারের পক্ষ থেকে বড় অঙ্কের ক্রয়াদেশ পাওয়ার ওপর। বর্তমানে ভারতের হাতে অগ্নি-৫ এর মতো দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যার পাল্লা প্রায় ৫,৫০০ কিলোমিটার এবং যা চীন ও ইউরোপের একাংশ পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের সামরিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

ভারতের হাতে কী কী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে?ভারতের হাতে বিভিন্ন ধরনের ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর কয়েকটি পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনেও সক্ষম। ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের বার্ষিকীতে ভারত অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায়। এটি ভারতের সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি। এর পাল্লা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার, যা চীনের পুরো ভূখণ্ড, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের কিছু অংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম। ভারতের অন্যান্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রিথ্বী-১-এর প্রায় ১৫০ কিলোমিটার থেকে অগ্নি-৪-এর প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত। এ ছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মসের মতো শক্তিশালী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ভারতের হাতে রয়েছে। এর পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার এবং গত বছরের পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতেও এটি ব্যবহার করা হয়েছিল